শোধ

 শিবব্রত বর্মনের লেখা বই 'শোধ'। ছোট পরিসরে লেখা এই বইটা নিয়ে খুব বেশি আশা ছিল না বটে তবে পড়ে শেষ করার পরে বেশ চমৎকার মনে হল। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা হলেও বইটা মূলত একটা মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকধর্মী ছোট উপন্যাস বা উপন্যাসিকা। তবে এই বইতে যুদ্ধকে ফোকাস করা হয় নি। বরং তার বদলে প্রতিশোধ নেওয়ার এক উন্মত্ত নেশায় পেয়ে বসা এক অস্থির যুবকের গল্প বলা হয়েছে। ঈর্ষার কারণে মানুষ যে কত ভয়ংকর কাজ করতে পারে সেটাও এই বইতে বেশ চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এবং এই পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে দাবার বোর্ডের চালের মাধ্যমে। 

এইগল্পের গল্পের প্রধান দুই চরিত্রের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আফসান চৌধুরী এবং অন্যজন গণিত বিভাগের তরুণ শিক্ষক ফিরোজ আহসান বেগ। ফিরোজ বেগ একজন আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভাবান দাবাড়ু, যে সদ্য করাচি থেকে পাকিস্তান ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে এসেছে। অহংকারে তার পা মাটিতে পড়ে না। দাবার বোর্ডের সবাইকেই সে তুচ্ছজ্ঞান করে। অন্যদিকে, আফসান চৌধুরী কেবল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব লাউঞ্জে দাবা খেলতে ভালোবাসেন। প্রতিযোগিতা তার পছন্দ না। টুর্নামেন্টে না খেললেও তার ক্ষুরধার চালের জন্য ক্যাম্পাসে সে সুপরিচিত। ১৯৭০ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে তাদের প্রথম মোলাকাত হয়। সে নিজেই আফসান চৌধুরীকে এক বোর্ড দাবা খেলার আমন্ত্রণ জানান। এবং গেমেই ফিরোজকে হারিয়ে দেন আফসান চৌধুরী। এর কিছুদিন পরে ফিরোজ গিয়ে হাজির হয় আফসান চৌধুরীর বাসায়। সেখানে আরেক বোর্ড দাবা খেলা হয়। এইবার ফিরোজ জিতে যায় তবে তীব্র ভাবে অপমানিত বোধ করে। সে বুঝতে পারে যে আফসান চৌধুরী ইচ্ছে করে হেরে গেছেন। এটা সে মেনে নিতে পারে না। এটা ফিরোজের আত্মঅহংকারে মারাত্মক আঘাত হানে। তার প্রেমিকা রওশন আরার দেওয়া এক পরোক্ষ খোঁচায় এই দ্বৈরথ কেবল দাবার বোর্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে এক বিষাক্ত ও ব্যক্তিগত রেষারেষিতে রূপ নেয়। এরপর ১৯৭১ সালে যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন এই দুই মানুষের ব্যক্তিগত যুদ্ধ এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী মোড় নেয়।

এই উপন্যাসে দাবাকে কেবল একটি খেলা হিসেবে রাখা হয় নি বরং এটাকে সেই সময়ের যুদ্ধের রূপক হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। স্বল্প হলেও ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ ঢাকার এক শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর জাকির ও কর্নেল খাদিমের উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের যে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা, তার সমান্তরালে চলতে থাকে আফসান ও ফিরোজের মনস্তাত্ত্বিক চাল। ব্লাইন্ডফোল্ড চেস খেলার যে এমন একটা ব্যাপার রয়েছে সেটা আমার জানা ছিল না। ব্যাপারটা বেশ চমৎকার মনে হয়েছে আমার কাছে। এছাড়া ছোটখাটো কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে যা একেবারে চমৎকার ভাবে মানিয়ে গেছে। যারা দাবা খেলা পারেন না তাদের কাছে হয়তো সামান্য একটু সমস্যা হতে পারে তবে সেটা খুব বড় ব্যাপার না। বইটা শেষ করে চমৎকার একটা অনুভূতি হবে আর মনে হবে এতো ছোট কেন হল বইটা ! 

এক বসায় বইটা পড়ে শেষ করে ফেলতে পারবে। দেরি না করে আজই পড়ে ফেলুন। 


শোধ
শিবব্রত বর্মন