যেকোনো অতিপ্রাকৃত গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে আশি-নব্বইয়ের দশকের চেয়ে ভালো সময় আর হয় না। এই গল্পের প্রেক্ষাপটও নব্বইয়ের দশক। গল্পের প্রধান চরিত্র এবং কথক শিপলু 'মাসিক হালচাল' পত্রিকার একজন সাংবাদিক। তবে তার কাজের ক্ষেত্রটা একটু ভিন্ন; সে দেশের নানান অলৌকিক এবং অপ্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে কাজ করে। দেশের যেকোনো প্রান্তে সে ছুটে যায় অতিপ্রাকৃত ঘটনার সন্ধানে। সেগুলোর পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে এবং পত্রিকাতে ফিচার হিসেবে প্রকাশ করে। দারুণ জনপ্রিয় এই সিরিজটার বদৌলতে দেশের অনেক মানুষই এখন শিপলুকে চেনে।
ঘটনা শুরু হয় যখন তার ছোটবেলার বন্ধুর কাছ থেকে ফোন আসে। তার ছোট ভাই জাহিদ কদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নব্বইয়ের দশকে আজকের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা এতো উন্নত ছিল না, তাই চাইলেই সহজে হারিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু জাহিদ ফিরে আসে দিন দশেক পরেই। তবে হারিয়ে যাওয়ার আগের এবং পরের জাহিদ এক মানুষ নয়। যে ফিরে এসেছে সে যেন অন্য কোনো মানুষ অথবা ঠিক মানুষও নয়। ব্যাপারটার ভেতরে যে অস্বাভাবিকতা বা অতিপ্রাকৃত ব্যাপার আছে, সেটা আর বলে দিতে হয় না। তাই শিপলুকে এই রহস্য তদন্ত করার অনুরোধ জানায় তার বন্ধু। শিপলুও রাজি হয়ে যায়।
ঠিক একই সময়ে আরেকজন মানুষের সাথে শিপলুর পরিচয় হয়—ঢাকা মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্র তৌকির। তৌকিরের জীবনে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে। প্রায়ই রাতের বেলা এক অদ্ভুত প্রাণী এসে হাজির হয় তৌকিরের হলের জানালায়। এটা যে কেবল তৌকির একা দেখছে তা নয়, তার রুমমেটও দেখেছে। এছাড়া তৌকিরের পারিবারিক ইতিহাসও বড় অদ্ভুত। তার সব আত্মীয়স্বজন কম বয়সেই মারা গেছেন এবং তারা মারা গেছেন অদ্ভুতভাবে। এখন তৌকিরের একমাত্র জীবিত পারিবারিক সদস্য তার দাদা নাজিব উদ্দিন। তিনি থাকেন সিলেটের এক সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। তৌকিরকে তিনি বারবার করে বলে দিয়েছেন যেন সে তার একুশতম জন্মদিনের আগেই তাঁর কাছে ফিরে যায়। তাদের একটি পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে এবং তিনি তৌকিরকে সেটি খুলে বলবেন। তৌকির শিপলুকে সাথে নিয়ে যায় সেই রহস্যটা বুঝতে এবং সমাধান বের করতে। এদিকে শিপলুর নিজেরও সিলেটের দিকে যেতে হতো, কারণ জাহিদ ফিরে আসার পর তার পকেটে একটি সিলেটের ট্রেনের টিকিট পাওয়া গিয়েছিল। জাহিদের হারিয়ে যাওয়ার সাথে সিলেটের যে একটা সম্পর্ক রয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
আসলেই কি শেষ পর্যন্ত শিপলু এই দুই রহস্যের সমাধান করতে পারবে? তৌকিরের দাদা আসলে কী পারিবারিক ইতিহাস বলবেন আর সেটার সাথে রাতের বেলার সেই পেঁচার মতো প্রাণীটার কী সম্পর্ক? তৌকিরও কি মারা যাবে তার অন্যান্য পারিবারিক সদস্যের মতোই? আর জাহিদের সাথে আসলে কী হয়েছিল, কেন সে রোবটের মতো হয়ে গেল? জাহিদ আর তৌকিরের ঘটনা কি কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত? এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে 'অনাহূত' বইটিতে।
আমি অন্য যেকোনো গল্পের চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্প বেশি পছন্দ করি, তাই এই বই আমার ভালো লাগবে এটাই স্বাভাবিক। লেখকের গল্প বলার ধরন এবং কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলটাও বেশ চমৎকার। বই পড়ার সময় কোনো বিরক্তি আসবে না। পড়তে পড়তে মনে হবে যেন অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশের ভেতরে আপনি ঢুকে পড়েছেন। সবশেষে যখন আসল রহস্যটা জানতে পারবেন, তখন মনে হবে এর চেয়ে ভালো কোনো কারণ আর হতে পারত না। তবে একটি ব্যাপার আমার কাছে মনে হয়েছে যে, গল্পের শেষ যুদ্ধ বা 'ফাইট সিন'টা আরেকটু ভালো হতে পারত।
যারা আমার মত অতিপ্রাকৃত রহস্য গল্প পছন্দ করেন, তারা এই বইটা অবশ্যই পড়তে পারেন। এটি প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর শিপলু সিরিজের দ্বিতীয় বই, তবে প্রথম বইটা না পড়লেও বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না।
