মার্বেল হল মার্ডার্স


 সেই আগের মতোই একই থিম। লেখক একটা উপন্যাস লিখছেন, আর সেই উপন্যাসের ভেতরে বাস্তব জীবনের অপরাধের সূত্র (ক্লু) দিয়ে গিয়েছেন। একটা থিম যখন প্রথমবার ব্যবহার করা হয়, সেটা বেশ চমৎকার মনে হয়; কিন্তু পরপর তিনবার যখন একই ধাঁচের লেখা লেখা হয়, তখন সেটাকে আর চমৎকার মনে হয় না। বরং বিরক্তি আসে। এই ‘মার্বেল হল মার্ডার্স’ পড়ার সময়ে আমার ঠিক একই বিরক্তি এসেছে।

গল্পের প্রধান চরিত্র হচ্ছে সুজান রাইল্যান্ড। ‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’-এর মৃত অ্যালান কনওয়ে এবং তার সৃষ্ট গোয়েন্দা অ্যাটিকাস পুন্ড আবার এই গল্পে ফেরত এসেছেন। সুজান ক্রিট থেকে ফিরে এসেছে। এখন সে বেকার, তার কাজের দরকার। তখন তার সামনে একটা অস্থায়ী চাকরি এসে হাজির হয়—একটি বই সম্পাদনা করতে হবে। আর এই বইটা হচ্ছে সেই বিখ্যাত অ্যাটিকাস পুন্ড সিরিজের। নতুন এক লেখক অ্যালান কনওয়ের ‘অ্যাটিকাস পুন্ড’ চরিত্রটি নিয়ে নতুনভাবে লিখছেন। সেই লেখকের নাম হচ্ছে এলিয়ট ক্রেস। এর আগে এলিয়ট ক্রেসের দুটি বই সুজান সম্পাদনা করেছিল এবং সেই বইগুলো তেমন সাফল্য পায়নি। এবার অ্যাটিকাস পুন্ডের মতো বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

পাণ্ডুলিপিতে থাকা উপন্যাসটি একটি বড় পরিবারকে নিয়ে, যেখানে লেডি মার্গারেটকে হত্যা করা হয়। অথচ তার শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ; কয়েক দিন পরেই তিনি এমনিতে মারা যেতেন। তাহলে কেন কেউ তাকে হত্যা করতে চাইবে? এই হত্যার কয়েক দিন আগে লেডি মার্গারেটের সাথে পুন্ডের দেখা হয় এবং সেখানে তিনি পুন্ডের সাহায্য চান। কিন্তু পুন্ড হাজির হওয়ার আগেই লেডি মার্গারেট খুন হন।

এই পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করতে গিয়ে সুজান জানতে পারে যে, এলিয়ট ক্রেস এই গল্পটা সাজিয়েছেন তার নিজের জীবন থেকে। সে বড় হয়েছে ‘মার্বেল হল’-এ। তার দাদি মিরিয়াম ক্রেস ছিলেন বিখ্যাত শিশুতোষ গ্রন্থের লেখিকা। জীবনে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক তিনি। এলিয়ট ক্রেস তার বইয়ের প্রতিটা চরিত্রকে সাজিয়েছেন মার্বেল হলে থাকা প্রতিটা মানুষের ওপর ভিত্তি করে। এলিয়ট বিশ্বাস করেন যে, বইয়ে লেডি মার্গারেটকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, বাস্তবে মিরিয়াম ক্রেসকেও ঠিক সেভাবেই হত্যা করা হয়েছে। অথচ বিশ বছর আগে এলিয়টের দাদি মিরিয়াম ক্রেসের মৃত্যু নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি।

একপর্যায়ে একটি রেডিও অনুষ্ঠানে এলিয়ট সবার সামনে এই অভিযোগ তোলেন যে, তার দাদিকে হত্যা করা হয়েছে এবং কে হত্যা করেছে সেটাও তিনি জানেন। তার নতুন বইতে তিনি এর সূত্র রেখে দিয়েছেন। এই হচ্ছে মোটামুটি বইয়ের থিম।

এবার আসি এই বইয়ের কোন ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি:

শুরুতেই যে কথাটা বললাম—বইয়ের ভেতরে আরেকটা বই, এই থিমটা একবার চমৎকার মনে হলেও পরপর তিনবার একই ব্যাপার ঘটলে তা আর চমকপ্রদ থাকে না। মানে, পরপর তিনবার একইভাবে লেখক বই লিখলেন আর তাতে খুনের ক্লু রেখে গেলেন! আবার সেটার সমাধান করতে হচ্ছে সুজানকেই!

এই বইয়ে লেখক এত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন যে, সেটা পড়তে গিয়ে রীতিমতো আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। বিশেষ করে ভেতরের বইটির বর্ণনা মোটেও সুপাঠ্য ছিল না।

এবার আসি চরিত্রের বর্ণনায়। এই বইয়ের সুজান রাইল্যান্ডকে আমার সবচেয়ে বড় ‘বোকা...’ মনে হয়েছে। ভাষার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এই শব্দ ব্যবহার না করলে মনের বিরক্তিটা প্রকাশ পাবে না। মানে একটা দৃশ্য কল্পনা করেন—আপনাকে একটা বই সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হলো। আপনার কাজ হচ্ছে সেই বইটাকে সম্পাদনা করা। এখন আপনি কেন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবেন? তার পরিবারের লোকেদের কাছে গিয়ে কেন তাদের অতীতের কথা জিজ্ঞেস করবেন? 

মাত্র একবারের পরিচয়ে কোনো মেয়ে কি কারো কাছে বলতে পারে যে তার পেটের সন্তান আসলে তার স্বামীর নয়, অন্য কারো? এটা বলা কি সম্ভব? তারপর যে আপনাকে অপমান করেছে বা যাদের সাথে আপনার সম্পর্ক ভালো নয়, এমন কারো দাওয়াতে আপনি কেন যাবেন? আপনি স্পষ্টই বুঝতে পারছেন যে দাওয়াতপত্রটা ভুল করে এসেছে, তাহলে কেন সেখানে গিয়ে অপমানিত হতে হবে? কারণ আপনি একজন আস্ত বোকা..! এছাড়া আর কিছুই না।

এই বইটা পড়ে আমার সত্যিই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, ‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’ একই লেখক লিখেছিলেন। ‘মুনফ্লাওয়ার মার্ডার্স’ পড়েও আমার মনে হয়েছিল যে সেখানে সুজানকে জোর করে বসানো হয়েছে। তারপরও সেটা কোনোমতে চলে যায়, কিন্তু এই বইটা আসাই উচিত হয়নি। যতখানি চমৎকার মনোভাব নিয়ে আমি ‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’ পড়েছিলাম, ততটাই বিরক্তি নিয়ে আমি এই সিরিজটা শেষ করলাম। যাদের ‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’ ভালো লেগেছিল, তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে—আপনারা এই বইটি পড়বেন না। আরেকটা কথা হচ্ছে এই বইতে ম্যাগপাই মার্ডার্স এর পুরো রহস্য উন্মোচন করা আছে। তাই যদি একান্তই পড়তে চান তবে অবশ্যই আগে ম্যাগপাই মার্ডার্স পড়ে নিবেন।