এই গল্পটা মূলত দুইজন বন্ধুর। গল্পের কথক আজাদ এবং তার বন্ধু রেজাউল। রেজাউল আজাদের থেকে দশ-বারো বছরের বড়। তবুও তাদের ভেতরে তুই-তোকারির সম্পর্ক। দুনিয়ার মানুষের সাথে রেজাউলের জানাশোনা। সে একজন মানুষ সংগ্রাহক। মানুষের সাথে মিশে মিশে সে মানুষ সংগ্রহ করে। তার সংগ্রহে থাকা মানুষগুলো কিন্তু সাধারণ মানুষ না। তাদের ভেতরে থাকতে হবে বিশেষ কিছু। তবেই রেজাউল তাদের সাথে মেশে। এভাবেই গল্পের কথক আজাদের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। কারণ রেজাউলের মনে হয়েছে আজাদ একজন দারুণ লেখক। সে তাই আজাদকে বারংবার চাপ দিতে থাকে একটা উপন্যাস লেখার জন্য। গল্পের প্লটের অভাব নেই রেজাউলের কাছে। এমনই একটা প্লট হচ্ছে লালমনিরহাটের বিখ্যাত বেশ্যাপল্লী। সেই বেশ্যাপল্লী থেকে জন্ম নেওয়া জিন্না কীভাবে এমপি-মন্ত্রী হয়ে সেই পল্লীটাকে উচ্ছেদ করে, সেই কাহিনী নিয়ে উপন্যাস লেখার জন্য আজাদকে সে চাপ দিতে থাকে। তার মতে লেখকদের থাকতে হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাই রেজাউল তাকে নানান জায়গায় নিয়ে যায় আর নানান রকম মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এদিকে আজাদ লেখালেখি থেকে দূরে সরে গেছে অনেক দিন। পড়াশোনা শেষ করে সে দিনাজপুর ফিরে এসে বাবার সিলিন্ডার ব্যবসায় বসা শুরু করেছে। জেলার সব থেকে বড় ব্যবসাটা তাদেরই। একমাত্র ছেলে হিসেবে এসব দেখাশোনার দায়িত্ব আজাদেরই। কিন্তু রেজাউল এটা মেনে নিতে পারে না। তার বক্তব্য হচ্ছে আজাদের জন্ম হয়েছে লেখক হওয়ার জন্য। সে ব্যবসায় সময় দিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করছে। আজাদ এই কথা শোনে বটে তবে রেজাউলকে পাত্তা দেয় না। নিজের অনলাইন প্রোফাইল থেকে রেজাউলকে ব্লক করে রেখেছে যাতে সে বিরক্ত না করতে পারে। আর টাকা খরচ করে ফোন দেওয়ার উপায় রেজাউলের ছিল না। কারণ তার কোনো রোজগার নেই।
এরপরই মাঝে রেজাউলের জীবনে এক বিপদ নেমে আসে। তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে চলে যেতে হয়। অনেকদিন আজাদের সাথে রেজাউলের কোনো যোগাযোগ থাকে না। এরই মধ্যে আজাদ বাবার ব্যবসা ছেড়ে নিজের ব্যবসায় মনোযোগ দেয়। বড়লোক লিচু ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করে সুখের জীবন যাপন করতে থাকে। তারপর একদিন আবারও রেজাউল আজাদের জীবনে ফিরে আসে। আজাদের সুখী সুখী ভাব দেখে রেজাউলেরও ইচ্ছে হয় সেও বিয়ে করে সুখের জীবন যাপন করবে। সে বিয়ে করে লায়লাকে। এই লায়লা সম্পর্কে তার দুঃসম্পর্কের ভাগনি হয়। তবে সম্পর্কটা বেশ দূরের, তাই বিয়েতে কেউ অমত করে না। লায়লা এক সময়ে ছিল ঢাকা শহরের পরিচিত মুখ—কবি লায়লা লাবণ্যময়ী। তবে কপালের ফেরে আজকে সে নির্জন গ্রামে বসবাস করে। সেখানে রেজাউল বিয়ে করে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবন বেশি দিন স্থায়ী হয় না। রেজাউলের জীবনে কান্তা নামের এক মেয়ে আসে। রেজাউলের জীবন একেবারে উলটপালট করে দেয়। সেই সাথে আজাদের জীবনও। আজাদ নিজের ঘরের বউকে ছেড়ে জড়িয়ে পড়ে অন্য মেয়ের সাথে, সেটাও রেজাউলের কারণেই।
মাহবুব মোর্শেদের লেখার যে দিকটা আমার সব থেকে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে লেখায় বাড়তি মেদ নেই। কাহিনী দ্রুত এগিয়ে চলে সামনের দিকে। তার গল্প বলার ধরন ভালো। এমন অনেক সময় দেখা যায় যে গল্পের প্লট ভালো থাকার পরেও গল্প বলার ধরন ভালো না হওয়ার কারণে সেটা পড়তে ভালো লাগে না। এখানে সেই ব্যাপারটা ঘটেনি। লেখক চমৎকার ভাবেই সেই গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে লেখক তার লেখার ভেতরে কোনো ঢাকঢাক গুড়গুড় রাখেননি। একেবারে মন খুলে লিখেছেন। এটাও একটা ভালো দিক। মাহবুব মোর্শেদের লেখার ভেতরে ‘বুনোওল’ বইটাই আমি প্রথম পড়লাম। এটা পড়েই অন্য বইগুলো পড়ার আগ্রহ জন্মালো। দেখা যাক সামনের বইগুলো কেমন লাগে। আপনারা চাইলে বইটা পড়তে পারেন। আশা করি সময় ভালো কাটবে।
