অবগুন্ঠন

 বইটা নিয়ে আমার যে খুব একটা আশা ছিল সেটা আমি বলব না। সত্যি বলতে কি ফেসবুকের বিখ্যাত লোকদের বই কিনে আমি প্রায় প্রতিবারই ধরা দেখেছি, তাদের বই পড়ে প্রচন্ড বিরক্ত হয়েছি। সাখাওয়াত হোসেনের অবগুন্ঠন কেনার সময়ও আমার মনে হচ্ছিল যে এই বইয়ের গল্প পড়েও আমার মেজাজ খারাপই হবে। কিন্তু সে ভুল ভাঙ্গল প্রথম গল্পটা পড়েই। প্রথম গল্পটার নাম আফরিন। গল্পের চরিত্র দুইজন। গল্পের কথক একজন উঠতি লেখক। তার প্রেমিকার নাম আফরিন। গল্পের উঠতি লেখক দুনিয়ার সবার সমালোচনা নিতে পারে কিন্তু তার প্রেমিকা আফরিন যখনই সামান্যতম কিছু বলে তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। আফরিন তাকে জানায় যে কীবোর্ড লিখলে তার লেখায় গভীরতা আসে না ঠিক। তাকে সে তাই উপহার দিয়েছে আট টাকার ইকোনো কলম। এতেই লেখকের মাথা খারাপ। গল্পে আফরিনের চরিত্রটা পড়ার পরে আমার মনে হল আমরা প্রত্যেক মধ্যবিত্ত যুবকরা ঠিক যেমন একটা প্রেমিকার স্বপ্ন দেখি আফরিন ঠিক সেই রকম, যার হয়তো এখন প্রেমিককে দেওয়ার মত কিছুই নেই কিন্তু উজার করে দেওয়া ভালোবাসা রয়েছে। এমন গল্প পড়তে পড়তে আপনা-আপনিই এদের শেষ পরিণতিটা ভাল আশা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যখন দেখা যায় শেষটাতে তাদের কাছে আসা হয় না তখন মনের ভেতরে একটা তীব্র হতাশা কাজ করে। আমার এখানে হল রাগ। গল্পের নায়কের উপরে এক প্রচন্ড রাগ এসে জড় হল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল, দাচোকাবো, উপন্যাস লিখবি ব্যাকআপ রাখবি না ক্যান? এতো বড় বেক্কল কেন তুই! গল্প শেষ করে আমি আমি থম করে বসে রইলাম। পরের এক সপ্তাহ আমি কোন বই পড়তে পারলাম না। যখনই কিছু পড়তে যাই আমার আফরিনের কথা মনে হয়। মনে হয় ঐ বেয়াক্কলের জন্য মেয়েটার সাথে এমন হল! বাস্তবের কেউ হলে হয়তো দেখা করে একটা চড় দিয়ে আসতাম! এটা আমার অনেক দিনের অভ্যাস। কোন বই বা গল্প যদি আমার ভাল লাগে তাহলে বই পড়ার পরের কয়েকদিন আমি কোন বইটই পড়ি না, পড়তে পারি না। ঘুরে ফিরে আমার সেই বইয়ের কথা মনে আসে। সেই বইয়ের চরিত্রের কথা মনে আছে। আফরিন পড়ে আমার ঘুরে ফিরে কেবল আফরিনের কথাই মনে হতে লাগল। 

সপ্তাহ খানেক পার হওয়ার পরে আবারও আমি বইটা পড়তে শুরু করলাম। পরের গল্পটার নাম অবম। বইতে গল্পের নায়ক তার স্ত্রীকে খুন করে রাতের বেলা নিয়ে যায় বালির ভেতরে লাশ পুতে ফেলতে। কিন্তু পথিমধ্যে তার সাথে আরও একজনের সাথে দেখা হয় যেও কিনা ঠিক একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। ব্যাপারটা একবার চিন্তা করে দেখুন। আপনি লাশ গুম করতে গিয়ে দেখলেন ঠিক আরেকজন তার বউয়ের লাশ গুম করতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না? লেখকের মাথা থেকে এমন কিছু যে বের হবে সেটা আমি ভাবি নি। 

চন্দ্রকুহর গল্পটা আমার কাছে অন্য রকম ভাল লাগল। গল্পটা ঠিক কোন ক্যাটাগরির ভেতরে ফেলা যায় আমি জানি না, সায়েন্সফিকশন নাকি রহস্য? আমার কাছে অবশ্য রোমান্টিকই মনে হল। একজন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিল সারা জীবন। আরেকটা প্রেমের গল্পের নাম মন্দন। অনেকে এটা অন্য ক্যাটাগরিতে ফেলতে চাইবে তবে আমার কাছে এটাও ভালোবাসারই গল্প। গল্পের কথকের মা, হাফসা এবং সবার শেষ সিমি সবাই কথককে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার গল্প পড়লে মনের ভেতরে একটা তীব্র হাহাকার জন্মে। ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খার হাহাকার! পুষ্পক গল্পটা পড়ে আবারও মন খারাপ হল আমার। কিশোরের জন্য মন খারাপ হল আর মন খারাপ হল তার প্রেমিকা পুতুলের জন্য। পুতুল কি কোন দিন জানবে না কিশোরের সাথে কী হয়েছিল? পুতুল মেয়েটা যে অপেক্ষা করে আছে সেটা কি কোনদিন শেষ হবে না? 

বইয়ের ধ্রুপদ আর ভুতভৈরবী গল্প দুটোর জন্য আলাদা স্থান দিতেই হবে। কুশিয়ারা গল্পটা অবশ্য আমার ততখানি ভাল লাগে নি। আরও কয়েকটা গল্প রয়েছে যার সব বর্ণনা দিলাম না। 

যারা ছোট গল্প পড়তে চান তারা এই অবগুন্ঠন বইটা অবশ্যই ট্রাই করে দেখতে পারেন।  

বইয়ের নাম অবগুন্ঠন
লেখকঃ সাখাওয়াত হোসেন
সতীর্থ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত।