আমার মস্তিষ্ক কাজ করে কীভাবে? মস্তিষ্ক জীবনভর যে জ্ঞান অর্জন করে, নানান তথ্য সংগ্রহ করে, মস্তিষ্কের ভেতরে যে চেতনার সৃষ্টি হয়, সময়ের দরকারে মস্তিষ্ক সেই সব জ্ঞান তথ্য আর চেতনা বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে। আমাদের মাথার ভেতরেই এই সব জ্ঞান, তথ্য, চেতনা থাকে। কিন্তু নন-লোকাল কনশাসনেস থিওরির মূল বক্তব্য হচ্ছে এই চেতনা, জ্ঞান আসলে একজনের মাথার ভেতরে থাকে না। এটা একটা সম্মিলিত ব্যাপার। চেতনা, জ্ঞান, তথ্য থাকে অন্য কোনো জায়গায়। আমাদের ব্রেনটা হচ্ছে একটা রিসিভার। দরকার মতো তথ্য ডাউনলোড করে নেবে। আমাদের মোবাইল ফোনটা যেমন রাজ্যের ইনফর্মেশন নামিয়ে আনতে পারে ইন্টারনেট থেকে, আমার মস্তিষ্কটাও সেই রকম। তবে মস্তিষ্কের ভেতরে নানান রেস্ট্রিকশন থাকে তাই একজন সব তথ্য রিসিভ করতে পারে না। এই থিওরি দিয়েছে ক্যাথেরিন সলোমন। সে হচ্ছে একজন নোয়েটিক সায়েন্টিস্ট, মানুষের চেতনা নিয়ে রিসার্চ করাই তার কাজ। এবং এটা নিয়ে সে একটা মারাত্মক বই লিখেছে। বইটা খুব জলদি প্রকাশিত হবে। সেই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে সে নানান জায়গায় লেকচার দিয়ে বেড়ায়। সে বইয়ে দাবি করে যে মানুষের চেতনা মূলত শরীরের বাইরে – মৃত্যুর ঠিক আগে মানুষের ব্রেনের সব রেস্ট্রিকশন দূর হয়ে যায়, এবং সবার চেতনা একটা ইউনিভার্সাল হোল হিসেবে মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে। এটা প্রমাণ করার জন্য তার কাছে বৈজ্ঞানিক এভিডেন্স আছে।
এই ক্যাথেরিন এক সময়ে আমাদের সিম্বলোজিস্ট রবার্ট ল্যাংডনের শিক্ষক ছিল এবং এখন সে আবার তার গার্লফ্রেন্ড। গল্পের শুরু হয় চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ শহরে। সেখানে ক্যাথেরিনের একটা লেকচার দিয়ে গল্প শুরু হয়। লেকচারের শেষে তারা অর্থাৎ ক্যাথেরিন আর ল্যাংডন হোটেলে ফিরে যায়। সেখানে রাতের বেলা ক্যাথেরিন একটা অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। আর পরদিন সকালে যখন ল্যাংডন তার জোগিং করতে বের হয় তখন একটা অদ্ভুত চরিত্র দেখতে পায় সে ব্রিজের উপরে। গত রাতে ক্যাথেরিন সে দুঃস্বপ্নে দেখে জেগে উঠেছিল, সে বর্ণনা সে দিয়েছিল ঠিক সেই দেবী চরিত্রের এক মেয়ে ব্রিজ দিয়ে হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে। ল্যাংডনের মাথায় তখন এই ভূত চাপে যে এখন হোটেলে খারাপ কিছু ঘটবে ঠিক স্বপ্নের মতো। সে দৌড়ে গিয়ে হাজির হয় হোটেলে। সবাইকে বের করে আনতে এলার্ম বাজায় আর নিজেও নদীতে ঝাঁপ। হাস্যকর!
এদিকে ক্যাথেরিন যে বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা পাঠিয়েছিল সেটা প্রকাশনীর সার্ভার থেকে হ্যাক হয়ে যায়। হ্যাকাররা পুরো বইটা মুছে দেয়। প্রকাশনীতে আইটি সিকিউরিটি বের করে যে যারা এই কাজ করেছে তারা আসলে সিআইএর মানুষ। সিআইএ কেন একটা বইয়ের পেছনে লাগবে? তারা যে কোনো মূল্যে বইটা প্রকাশ হতে বাধা দিতে চায়। তাহলে আসলে কী আছে ক্যাথেরিনের সেই বইতে? কী এমন তথ্য লুকিয়ে আছে যা সিআইএর জন্য হুমকি হবে?
ল্যাংডনের পেছনে পড়ে যায় প্রাগের পুলিশ। তাকে যে কোনো মূল্যে শেষ করতে বদ্ধপরিকর। এদিকে ল্যাংডন খুঁজে বেড়ায় ক্যাথেরিনকে। এক সময় তাদের দেখা হয় বটে তবে তখন পুলিশ ল্যাংডনের পেছনে পড়ে আছে। তাকে গ্রেফতার করতে নয় বরং গুলি করে মারতে। শেষ চেষ্টা হিসেবে ল্যাংডন ক্যাথেরিনের বইয়ের পাণ্ডুলিপির শেষ প্রিন্টেড কপিটা আগুনে পোড়িয়ে দেয়।
তবে গল্প সেখানেই শেষ হয় না। তারা জানতে পারে যে প্রাগ শহরের নিচে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে একটা বোম্ব শেল্টার তৈরি হয়েছিল; সেই শেল্টারকে এখন সিআইএ তাদের গবেষণার জন্য একটা ল্যাব বানিয়েছে। এবং সেই ল্যাবে মানুষের মস্তিষ্কের চেতনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। শাসার মস্তিষ্কে একটা ইলেক্ট্রনিক চিপ বসানো হয়েছে। তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেটার সাহায্যে শত্রুদেশের নানান গোপন তথ্য বের করে নিয়ে আসা হয়। এই থ্রেশহোল্ড মূলত ত্রিশ বছর আগের একটা সিআইএ প্রোজেক্টের উন্নত রূপ। এক সময় থ্রেশহোল্ড ধ্বংস করে দেওয়া হয় আর শাসাকে অ্যাসাইলাম হিসেবে আমেরিকায় আশ্রয় দেওয়া হয়।
মূলত সিআইএ ক্যাথেরিনের পাণ্ডুলিপির পেছনে পড়ে ছিল কারণ এই থ্রেশহোল্ড প্রোজেক্টটা তৈরি হয়েছিল ক্যাথেরিনের এক রিসার্চের উপর ভিত্তি করে। ক্যাথেরিন যখন পড়াশোনা করত সেই সময়ে তার একটা থিসিস জমা দিয়েছিল। সেটা যখন পেটেন্ট করতে যায় তখন সেটা রিজেক্ট করে দেওয়া হয়। সিআইএ সেটার উপর ভিত্তি করেই এই সব কাজকর্ম করেছে। এই থিওরিটাই ক্যাথেরিন তার বইয়ের শেষে জুড়ে দিয়েছিল। এই কারণে সিআইএ তার পাণ্ডুলিপি প্রকাশ হতে দিতে চাচ্ছিল না।
এই বইয়ের আরেকটা বড় চরিত্র হচ্ছে গোলেম। সে নিজেকে শাসার গার্ডিয়ান এঞ্জেল হিসেবে দেখে। সেই শুরু থেকেই সে শাসাকে রক্ষা করে আসছে। শাসার উপরে যে নির্যাতন পরীক্ষা করা হয়েছে সেটা গোলেমের সহ্য হয় না। তাই সে একে একে থ্রেশহোল্ডের সাথে জড়িত সবাইকে খুন করে। সর্বশেষ থ্রেশহোল্ডের হেড ফিঞ্চকেও মেরে ফেলে সে।
এই মূলত হচ্ছে ড্যান ব্রাউনের নতুন বই সিক্রেট অব সিক্রেটসের মূল গল্প। এই বই শেষ করার পরে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে যে ড্যান ব্রাউন এঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমনস, দ্য দা ভিঞ্চি কোডের মতো বই লিখেছে সে একই সিরিজের সিক্রেট অব সিক্রেটসও লিখেছে! কী বেহুদা কাণ্ডকারখানা দিয়ে ভর্তি এই বই। রবার্ট ল্যাংডন সিরিজের শেষ দুটো বইও যেন খুব বেশি যথাযথ ছিল সেটা বলব না। দ্য লস্ট সিম্বলের পরে এই সিরিজের ভালো বই আসেনি। কিন্তু এই সিক্রেট অব সিক্রেটস পড়ার পরে কেবল একটা কথাই মনে হল যে আট বছর ধরে বা-ল লিখেছে!
