Saturday, February 15, 2020

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অক্টোবর রেইন

গল্পের কাহিনীঃ গল্প শুরু হয় বিয়ের কথা বার্তা দিয়ে । নায়িকার নাম সকাল শেহজাদী । সে আইবিএ থেকে গ্রাজুয়েট করা ছাত্রী । মন থেকে কাউকে ভালবাসতে পারে নি কারন তার মতে মনের মানুষ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভেতর থেকে একটা সিগনাল আসে । সেটা যত সময় না আসছে তত সময় আসলে কাউকে ভালবাসা যায় না । 

একদিন ক্যাম্পাস থেকে ফিরে দেখতে পায় যে তার বাবার এক পুরানো বন্ধু ওর তার স্ত্রী ড্রয়িং রুমে এসে গল্প করছে । ভদ্রমহিলা তার ছেলের জন্য সকালকে পছন্দ করে গেল । তাকে আমেরিকা থেকে ঘুরে আসার জন্য এবং তার ছেলের সাথে সাক্ষাত করে আসার জন্য আমন্ত্রন জানিয়ে গেল । সকাল বিচার বিবেচনা করে দেখলো যে আমেরিকা যাওয়া মানেই তো আর বিয়ে করে ফেলা নয় একটু ঘুরে আসাই যাক । তাছাড়া তার প্রাণের বান্ধবী নাবিলাও পড়ালেখার জন্য আমেরিকাতে রয়েছে এখন। তার সাথেও জম্পেস একটা দেখা করে আসা যাবে । মূল কাহিনী এখান থেকেই শুরু ।
সকাল জানতো যে তার বাবার বন্ধুর এক ছেলে এবং এক মেয়ে, ফাহাদ এবং টিলি । সেই ছেলের সাথেই তার বিয়ের কথা বার্তা চলছে । কিন্তু এখানে এসে জানতে পারে যে এই বাড়িতে আরও একজন বাস করে । সে হচ্ছে রহমান সাহেবের আগের পক্ষের ছেলে । ছেলের নাম আরশান ! ইনিই আমাদের গল্পের নায়ক ।
এতোদিন সকাল শেহজাদী ভেতর থেকে যে সিগনালের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সেদিন সকালের নাস্তার টেবিলে আরশানকে একবার দেখেই সে সিগনাল সে পেয়ে গেল । ছোট ভাইকে বিয়ের জন্য এসে বড় ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করলো হরিণডাঙ্গার রাজকন্যা ।
তবে আগুন কেবল একদিকেই লাগে নি । সকাল যেমন আরশানের প্রেমে পড়েছে আরশানও সকালের প্রেমে পড়লো । তবে আরশান নিজেকে কিছুতেই ঠিক মত বুঝতে পারে না । ছোট বেলা থেকেই একা একা বড় হওয়া, তার মায়ের এভাবে অন্য একজনের হাত ধরে চলে যাওয়া, তার প্রতি সৎ মায়ের আচরন সব কিছু মিলিয়ে আরশানকে এক জটিল ধাঁধার ভেতরে ফেলে দিয়েছে । কোন মেয়েকে সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না । কোন দিন বিয়ে করার ইচ্ছে তার ছিল না । তার জগৎ তার কাজ, তারর বেহালা আর এরিককে নিয়ে ।
কেউ একবার এগিয়ে আসে তো অন্য জন পিছিয়ে যায়। মুখ ফুটে কেউ বলতেই পারে না যে ভালবাসি । মানব মন বড় অদ্ভুত। খুব ভালবাসা স্বত্তেও সকালের মুখ ফুটে কথা গুলো না বলতে পারে না এই ভেবে যে আরশান কি ভাববে আর আরশানের অতীত জীবনের ঘটনা এবং আন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য সকালের কাছেও সে আসতে পারে না কোন এক বাঁধার কারনে। আরও কত প্যারা যে দুজন সহ্য করে তার কোন ঠিকানা নেই। বারবার ভুলবোঝা বুঝি বারবার নানান ঝামেলার পর এক সময়ে সকাল আর আরশান দুজনই দুজনের কাছে চলে আসে । মুখ ফুটে বলে যে ভালোবাসি। তবে সেই রাস্তা অনেক লম্বা ! সেই লম্বা রাস্তা জুড়েই হচ্ছে আমাদের এই গল্প অক্টোবর রেইন।
মোটামুটি হচ্ছে এই হচ্ছে কাহিনী । অনেক দিন পর আমি একটা লম্বা উপন্যাস পড়তে পারলাম । বলা চলে এই গল্পটা এই বছর আমার পড়া প্রথম বই । এই বই পড়েই আমার রিডার্স ব্লক কেটে গেছে। এবং এটাই আমার পড়া লেখিকার প্রথম বই ।
এই গল্পের ভাল দিক আছে অনেক । লেখিকার সাবলিল গল্প বর্ণনার ধরন যা আমার সব থেকে পছন্দের ব্যাপার । গল্প কিংবা কাহিনী যত ভালই হোক না কেন লেখিক/লেখিকা যদি তা সাবলিল ভাবে তুলে ধরতে না পারেন তাহলে তাহলে সেটা পড়ার আগ্রহ থাকে না । এই গল্পের ক্ষেত্রে সেটা মোটেও হয় নি । প্রায় সাড়ে চারশ পাতার বইটা আমি দুই বৈঠকে পড়ে শেষ করেছি । গল্পটা আমাকে চুম্বকের মত টানছিলো । বারবার মনে হচ্ছিল এখনই কি হবে আবার । আবার না কি ঝামেলা বাঁধে । এই বদ মেয়েটা মুখ ফুটে বলে না ক্যান ভালোবাসি !!
গল্পের চরিত্র গুলোর চিত্রায়ন বেশ হয়েছে । বিশেষ করে লেখিকা ঠিক যেমন ভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে সেটা তিনি পেরেছেন । নায়ক আর নায়িকার মানসিক অবস্থাটুকু পাঠকের মাঝেও তিনি সঞ্চলন করতে সক্ষম হয়েছে । আমি যখন আরশানের দিক থেকে গল্প পড়ছিলাম আমার কাছে মনে হচ্ছিলো যেন আমি ঠিক আরশানের মত করেই চিন্তা করছি । নিজেকে আরশানের স্থানে বারবার বসাতে হচ্ছিলো আমার । নিজের কিছু স্বভাবের সাথে আরশানের স্বভাবের মিল খুজে পাওয়ার কারনেই হয়তো এই চরিত্রটা সব থেকে বেশি টানছিল আমাকে । এছাড়াও গল্পে আন্টি চরিত্র গুলো একেবারে বাস্তব হয়েছে । অর্থ্যাৎ আমাদের দেশের মহিলারা ঠিক যেমন হয়, যেমন তাদের আচরন হয় লেখিকার লেখনীতে সেটা একেবারে বাস্তব ভাবে ফুটে উঠেছে । মাঝ বয়সী আন্টিরা সব সময়ই এমন ।
আরেকটা ভাল দিক হচ্ছে গল্পের গতি বেশ ভাল । কোন কাহিনী এক স্থানে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করে নি । দ্রুত এগিয়ে গেছে সামনের দিকে । মাঝ খানে একটু সময় গল্পটা একটু থেমে গিয়েছিলো মনে হয়েছিলো । তবে সেটা বাদ দিলে পুরো গল্প এগিয়েছে বেশ চমৎকার ভাবে ।
বইটার খারাপ দিক খুবই কম আছে । যেমন কয়েকটা স্থানে লেখিকা জটিল বাক্যের মাঝে দাড়ি দিয়ে ফেলেছেন । আমার কাছে মনে হয়েছে যে প্রুফ রিডিংয়ের দিকে আরেকটু ভাল করে নজর দিয়ে এই ভুলটা হত না । তবে বানান ভুল আমার একদম চোখে পড়ে নি । এটা খুবই চমৎকার একটা ব্যাপার । আরেকটা ব্যক্তিগত অপছন্দ দিক ধরা পড়েছে আমার চোখে । এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত অপছন্দ । বইয়ে চরিত্র বর্ণনায় মাঝে মাঝে "চাচী বললেন, চাচা বললেন" ধরনের বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে । এর স্থানে যদি রহমান সাহব বললেন রহমান সাহেবের স্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বর্ণনা করা হত তাহলে আমার কাছে আরও বেশি ভাল লাগতো । এটা অবশ্য একেবারেই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ ।
সব মিলিয়ে অক্টোবর রেইন পড়ার মত একটা বই । বইটার দাম একটু বেশি । মুদ্রিত মূল্য ৬৫০ টাকা । সাধারন পাঠকদের কাছে এটা অনেক বেশি । তবে অবশ্যই সবাইকে আমি বইটা পড়তে বলবো । দাম একটু বেশি হলেও অপচয় হবে না এই টুকু বলতে পারি। 

========
অক্টোবর রেইন
ওয়াসিকা নুযহাত
বই বাজার প্রকাশনি

No comments:

Post a Comment